
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা):
খুলনা বিভাগের ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের ঐতিহাসিক টিপনা গ্রাম। সরকার ঘোষিত ‘গ্রাম হবে শহর’ অর্থাৎ ‘আদর্শ গ্রাম’ রূপকল্পের আওতায় এই গ্রামে রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আধুনিক নাগরিক অবকাঠামোর ছোঁয়া লেগেছে। দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে জীবনযাত্রায়। তবে গ্রামীণ শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু ‘টিপনা শেখ আমজাদ মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-টি আজও সরকারি করার সুযোগ পায়নি। ফলে শিক্ষার আধুনিকায়ন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে হতাশা।এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবক বয়োজ্যেষ্ঠ শেখ আবুল হোসেন বলেন:”টিপনা গ্রামটি অবকাঠামোগতভাবে মডেল গ্রামে পরিণত হলেও শিক্ষার প্রধান প্রাণকেন্দ্রটি অবহেলিত রয়ে গেছে। ডুমুরিয়ার এই অঞ্চলে বহু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। বিদ্যালয়টি সরকারি হলে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক সংকট ভুলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে। সরকারের উচিত এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির প্রতি দ্রুত ইতিবাচক নজর দেওয়া।”বিদ্যালয়ের সুযোগ্য প্রধান শিক্ষক মোঃ মতিয়ার রহমান বলেন:”আমাদের বিদ্যালয়টি খর্নিয়া ইউনিয়ন তথা পুরো ডুমুরিয়ার মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ও সুনামধন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে আমাদের ফলাফলের রেকর্ড অত্যন্ত ঈর্ষণীয়। টিপনা গ্রামটি এখন ‘আদর্শ গ্রাম’ হিসেবে রূপ নিয়েছে—রাস্তাঘাট ও পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন নির্মাণসহ ব্যাপক আধুনিকায়ন হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এ অঞ্চলের আলোর দিশারী এই মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি এখনও সরকারি করা হয়নি। বিদ্যালয়টি সরকারি করা হলে এলাকার দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা নামমাত্র খরচে উন্নত মানসম্মত শিক্ষা পাবে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যেন দ্রুত এই বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।”বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ আমজাদ হোসেন বলেন:”এলাকার শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার দূরদর্শী স্বপ্ন নিয়ে আমরা এই প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলাম। বিগত বছরগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিশ্রম ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রশংসনীয় ফলাফল অর্জন করে আসছে। ‘গ্রাম হবে শহর’ পরিকল্পনার রূপায়ণ সম্পূর্ণ হবে তখনই, যখন গ্রামের এই বাতিঘরটি সরকারি স্বীকৃতি পাবে। জীবনের এই সায়াহ্নে এসে আমার আকুল আবেদন—সরকার যেন অবিলম্বে বিদ্যালয়টিকে সরকারি ঘোষণা করে খর্নিয়া ইউনিয়নবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করে।”ডুমুরিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দিবাশীষ বিশ্বাস বলেন:”টিপনা শেখ আমজাদ মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষার পরিবেশ এবং সার্বিক কার্যক্রম বেশ সন্তোষজনক। গ্রামীণ পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারীকরণ সম্পূর্ণ নীতিগত এবং মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। তবে নীতিমালার আলোকেও যদি কোনো যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে থাকে, তবে এটি তার মধ্যে অন্যতম। যদি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সরকারি করার আবেদন বা প্রস্তাব পাঠায়, আমরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ প্রেরণ করব।”ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার জানান:”প্রধানমন্ত্রীর ‘গ্রাম হবে শহর’ দূরদর্শী ধারণার মধ্য দিয়ে টিপনা গ্রামে রাস্তাঘাট ও ড্রেনসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া একটি গ্রামের প্রকৃত রূপান্তর অসম্ভব। টিপনা শেখ আমজাদ মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি সরকারি করার বিষয়ে স্থানীয়দের এই দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক। আমরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিদর্শন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে আমরা দ্রুতই ঊর্ধ্বমুখী কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ ফাইল পাঠাব।”বর্তমানে খুলনা জেলা শিক্ষা অফিসার (মাধ্যমিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এস, এম, ছায়েদুর রহমান বলেন:”সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে। খর্নিয়া ইউনিয়নের টিপনা শেখ আমজাদ মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির ভৌগোলিক অবস্থান, শিক্ষার্থী সংখ্যা ও ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত তথ্যাদি যাচাই করা হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে প্রস্তাবনা ও পরিদর্শন প্রতিবেদন আমাদের কাছে এলে, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।”স্থানীয়দের দাবি ও প্রত্যাশা টিপনা গ্রামের সাধারণ বাসিন্দা এবং অভিভাবকরা জানান, গ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন তাদের জীবন মান বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু এলাকার ঐতিহ্যবাহী একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি সরকারি না হওয়ায় শিক্ষা খাত কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। অতি দ্রুত ‘টিপনা শেখ আমজাদ মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-টিকে সরকারি ঘোষণা করে খর্নিয়া ইউনিয়নের শিক্ষার পূর্ণ রূপান্তর ঘটানোর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ডুমুরিয়াবাসী।
